অধ্যাপক সরওয়ারের “মহেশখালীর রাজনীতি-৪”

রিপোটার পরিচিতি :
  • আপডেট সময় : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২০

হোয়ানকের রাজনীতিঃ রাজনীতির উর্বর ভূমিতে অনুর্বর নেতৃত্ব।

স্বাধীনতার আগে হোয়ানক ইউনিয়ন যাদের দ্বারা পরিচালিত হতো তারা মাস্তান পালতো না। আইনের মারপ্যাঁচে কাউকে ঠকাতে ও ব্যক্তিগত রেষারেষি দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে গিয়ে ক্ষতি করার মানসিকতা ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়নি।
রাজার-বর পরিবার অন্যের জমিজমা, সম্পদ লুণ্ঠনের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেনি। রাজার-বর পরিবার দীর্ঘদিন শাসন করে। খুন খারাবির চিন্তা না থাকার কারণে এলাকার মানুষ নিরীহ সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। তবে নিজেদের সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষা বিস্তারে অনীহা এলাকাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। এলাকার মুরব্বিদের কাছ থেকে জানা যায় একবার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আয়োজন শুরু হলেও বেড়া টিন গাছ জোগাড় হলো, ঘর নির্মাণও প্রায় শেষ। শেষ পর্যন্ত টিন গাছ চলে গেল বিদ্যালয় নির্মাণও আর হলো না।
লদ্দিনর পরিবারও এলাকা শাসন করে। তারাও ব্যক্তিগত সমস্যা সংঘাতে না গিয়ে সাধারণ জীবনযাপনে এলাকা পরিচালনা করে। খুনখারাবির ঘটনা এ সময়েও সংঘটিত হয়নি। যারা ভোটাভোটি করত তারা ভোট জোগাড়ের জন্য যতটুকু শ্রম কৌশল প্রয়োজন শুধু তাই করে যেতো। এলাকার সাধারণ মানুষ খুব বেশি ক্ষতির সম্মুখীন না হওয়ার কারণে বিশেষ ধরনের শান্তি ভোগ করতো। নানাভাবে আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ থাকার কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে এরা বেঁচে যায়। রাজনৈতিক সহনশীলতা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সামাজিক ঐক্য এলাকায় সম্প্রীতির বোধ গড়ে উঠে। শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা সমাদর পায়।

মোহাম্মদ ইসহাক বিএ যখন বিএ পাস করেন এলাকার অনেক লোক তাকে দেখতে আসেন। দোয়া করেন। তার সদাচরণে এলাকার লোক খুশি। জনগণের চাহিদা মেটাতে গিয়ে চাকরি ছেড়ে এলাকায় চলে আসেন। মানুষের শ্রদ্ধা সম্মান ভালোবাসা তাকে জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। নিজের ভেতর স্বাধীনতার বোধ থাকায় সৃজনশীল বৃত্তি পোষণ করার কারণে এলাকার মানুষ উপকৃত হয় এবং সুনাম সম্মানের অধিকারী হয়।জনগণ প্রথমে ইউনিয়ন কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত করে। স্বাধীনতার পর ইউনিয়ন কাউন্সিলের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা হোয়ানককে বিশিষ্ট স্থানে অধিষ্ঠিত করে। তাঁর ব্যক্তিগত সততা সদাচরণ সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে সম্মানের আসনে অধীন করে। দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় যখন খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন তখনই সেই জনপ্রিয়তা কাল হয়ে দেখা দিল। এলাকার কিছু শিক্ষিত ক্ষমতালোভী ব্যক্তিরা ক্ষমতার পরিবর্তন আশা করলো এবং নানা কৌশল ষড়যন্ত্রে তাঁকে হারিয়ে দিয়ে এলাকার নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলল। ভাগ্যিস যিনি নির্বাচিত হলেন তিনিও শিক্ষিত লোক এবং স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। আমার জানা মতে তিনিও মোহাম্মদ ইসহাক বিএ কে সম্মান করতেন এবং এলাকার খুন খারাবির ব্যাপক প্রসারে ভূমিকা রাখেন নি।
এলাকার জনগণ পরবর্তী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তাঁকে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি জনগণের মতামতকে শ্রদ্ধা জানান এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ষড়যন্ত্রমূলক আচরণের শিকার হয়ে হেরে যান। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ক্ষোভ আরও বেড়ে যায় এবং পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে ভালবাসার নিদর্শনি হিসেবে জয় লাভের মধ্য দিয়ে এলাকাকে সম্মানিত করেন। মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা একজন সাধারন ঘরের মানুষকে অসাধারণ বানাল। তিনি আজীবন সহজ-সরল সাধারণ জীবন যাপন করে মানুষের ভালবাসার প্রতিদান দিলেন।
এলাকার মানুষ মোহাম্মদ ইসাহাক বিএ র কাছ থেকে যা পেলেন অন্যের কাছ থেকেও তাই আশা করতে থাকলেন। না পাওয়ার বেদনা মানুষের অন্তরে অভাবের সৃষ্টি করে ক্ষমতার বদল হতে থাকে ক্ষমতার মোহ পারিবারিক কলহের জন্ম দেয়। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন জনগণের ভালোবাসার ধন ভিন্নখাতে প্রবাহিত হলো। শক্তিমানের ক্ষমতায় আরোহণের কাল হলো।
ক্ষমতালোভী পরশ্রীকাতর তোয়াজকারী লোকের সংখ্যাধিক্য এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করে এবং এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে অসম্মানের আওতায় আসা শুরু করে। সুবিধাবাদী লোক এর মূখ খুলে যায়। এলাকার মানুষ পরিবর্তন আশা করে এবং তার প্রয়োগ ঘটায়। দীর্ঘদিনের শান্তি পাওয়া লোক শান্তির খোঁজে তৎপর। ক্ষমতালিপ্সা মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। পরিবারে পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে শক্তিমানের আবির্ভাব ঘটে। ক্ষমতার পথপরিবর্তনে বর্বর যুগের সূচনা ঘটে।
হোয়ানকের মানুষ শান্তির খোঁজে পথ হাঁটে। অযোগ্য ব্যক্তির ঘনঘন ক্ষমতায় আসা তাদের দিশায় আঘাত ঘটায়। শেষ পর্যন্ত খুনখারাবির আওতায় চলে আসে। রিক্সা ভাড়া ট্যাক্সি ভাড়া না দেয়া লোক ক্ষমতায় এসে পুরো এলাকাটা অসম্মানিত করে। শক্তির মহড়ায় শক্তি অগ্রাধিকার পায়।
অশিক্ষিত শক্তিমান ক্ষমতায় আরোহণে সুবিধাবাদী চক্র সক্রিয় হয়। এরা ব্যবহার করে সুবিধা লাভ করে এবং বিপদের সময় পালায়। ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষতিসাধনে অপতৎপর থাকে।হোয়ানকের মানুষ ভিন্ন সাধে পা বাড়ায়। যারা শান্তিতে ছিল তাদের অধিকাংশই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল। আর যারা বাকি অসহায়ের মতো অতীতের সুখ স্মৃতি নিয়ে পুত নাতিদের গল্পগুজব করে সময় কাটায়। তারপরও মানুষ হাল ছাড়ে না শান্তির খোঁজে বেরোয়।

মাদকসেবী, অবৈধ অস্ত্রধারী শক্তিমান যখন ক্ষমতায় এলো প্রতিবছর খুন লুটতরাজ চোখে পড়ল। প্রকাশ্যে গোপন অস্ত্রের মহড়া দেখতে পেল এলাকার জনগণ। যুবক তরুণ মাদকাসক্ত হলো এলাকার শান্তি বিনষ্ট হলো। সর্বনাশের খেলায় মেতে উঠলো এলাকা।খুঁজতে থাকে মোঃ ইসাহাক বিএ কে। অবশেষে ক্ষমতায় বসানো তার এক ছেলেকে।

মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচল। দফায় দফায় শান্তির প্রস্তাব দিল। নিঃসংকোচে বলার আয়োজন হলো। সবাইতো ইসহাক বিএ হতে পারে না। প্রত্যাশার প্রাপ্তি অধরাই থেকে গেল। দিনে দিনে মাস হলো মাস ফুরিয়ে বছর গেলো মানুষের আশা আশায় থেকে গেল। অতৃপ্ত মানুষ সুখ শান্তি আর ভালোবাসার কাঙ্গালে পরিণত হল।যোগ্য হয়ে গড়ে উঠতে প্রচুর সাধনা অধ্যবসায় অন্তর্দৃষ্টির প্রয়োজন যা আমাদের নেই।
কালাগাজির পাড়ায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহাকান্ড ঘটে গেল। দুই পরিবারের সখ্য বিনষ্ট হলো। মীমাংসায় না গিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীর অংশ তেলে জল ঢেলে দিয়ে লঙ্কাকান্ড ঘটিয়ে দিলো। মৃত্যুর বিপরীতে মৃত্যু দেখা দেয়।
শান্ত জনপদ অশান্ত হয়ে ওঠে সাধারণ জনগণও চরম অশান্তিতে দিন কাটায়।
কেরোনতলী রণক্ষেত্র। পাটা ওতার ঘষাঘষি প্রাণ যায় মরিচের।পারিবারিক সম্পদ ও সরকারি জমি দখল ও ভোগ করার লোভ ও দ্বন্দ্ব এলাকায় অশান্তির কারণ।
বগাচতর এরশাদের রাজত্ব, ফকিরখালি আইনের বেড়া কল, হেতালিয়া ফরিদকল মাঝখানে ফড়িয়াদের দখল হোয়ানকে অসস্থির কারণ।
দুজন লোকের কথা বলি সিরাজুল হক ডাকনাম বেঙ্গুরা। আমরা তাকে বেঙ্গুরা বাবু বলে ডাকতাম দলীয় কোন পদ-পদবিতে ছিলেন না। চালচলন স্বভাব-চরিত্র নিজেকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেলেন। অফিস-আদালতে নিজের এলাকায় অত্যন্ত যত্নসহকারে নিজেকে গুছিয়ে রাখতেন এবং এলাকায় একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করছেন। আরেকজন মোহাম্মদ এস্তেপাজ তিনি নিরব থাকতেন ব্যক্তিত্ব ছিল প্রশংসা করার মত। নিরবে নিরবে জনগণের সেবা করতেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব তাকে অন্য থেকে আলাদা করে রাখতো। তার মুখের হাসি ভুবনভোলাতো। ইনিও কোন রাজনৈতিক দলের পদ পদবীধারী ছিলেন না। কিন্তু কাজকর্মের নিজের ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশের কোনো অংশেই তিনি কম যাননি।রেড ক্রিসেন্ট এর মত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে জড়িত থেকে সাধারণ মানুষের উপকার করে গেলেন।
মোহাম্মদ ইসহাক বিএ মারা গেলেন। হোয়ানকের রাজনীতি মারা গেল।এখানে নেতা নেই নেতার পূজারী আছে। দিনদিন হোয়ানকের রাজনীতির মান নামতে নামতে তলানীতে এসে ঠেকেছে। নেতা শব্দটি ব্যবহার করতে বুক কাঁপে। এখানে যারা আছেন তাদের বেশিরভাগই নে তা। যা দিবি তাই নেব এমন লোকের সংখ্যা অহরহ। যা দেয় তাই নে এমন নেতার ছড়াছড়ি।
রাজনীতির উর্বর ভূমি হোয়ানক এখন বিশ্রী জনপদ। এখানেও কথা বলার স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত দক্ষিণের চক্ষু আমাদের রুদ্ধ করে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। রাজনৈতিক সহনশীলতা সহমর্মিতা সুন্দরভাবে বসবাসের অনুভূতি এবং তার কার্যকর প্রয়োগের অপেক্ষায় নিশিদিন।

মোহাম্মদ ছরওয়ার কামাল
অধ্যক্ষ ,হোয়ানক কলেজ, মহেশখালী ।

এই সংবাদটি শেয়ার করার দায়িত্ব আপনার

এই ক্যাটাগরীর অন্যান্য সংবাদ সমূহ